সীমান্ত পাড়ির মরণফাঁদ, কয়লা খনিতে বাড়ছে প্রাণহানি
অমিত তালুকদার, সুনামগঞ্জ:
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্ত সংলগ্ন ভারতের মেঘালয় রাজ্যে একটি কয়লা কোয়ারিতে ধসের ঘটনায় মজিবুর রহমান (৩৫) নামে এক বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংঘটিত এ ঘটনায় সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবৈধ পারাপার, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম ব্যবস্থার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে।
নিহত মজিবুর রহমান তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের বাসিন্দা। পারিবারিক সূত্র জানায়, গত রোববার বালিয়াঘাট সীমান্তের ৯৬/৭-এস পিলার এলাকা দিয়ে তিনি সহ কয়েকজন শ্রমিক ভারতের মেঘালয়ের নকলাম এলাকায় প্রবেশ করেন। সেখানে অবৈধভাবে কয়লা উত্তোলনের সময় হঠাৎ কোয়ারির ভেতরে ধস নামলে তিনি গর্তে আটকা পড়ে গুরুতর আহত হন। সহকর্মীরা দ্রুত বের হয়ে আসতে পারলেও মজিবুরকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
পরে সহকর্মীরা তার মরদেহ উদ্ধার করে সীমান্ত পেরিয়ে দেশে নিয়ে আসেন। সন্ধ্যায় মরদেহটি লালঘাট গ্রামের শ্বশুরবাড়িতে পৌঁছালে রাতেই তাহিরপুর থানা পুলিশ তা উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বালিয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে একটি সক্রিয় দালাল চক্র নিয়মিতভাবে শ্রমিকদের অবৈধভাবে মেঘালয়ে পাঠাচ্ছে। নিজেদের ‘বিজিবি সোর্স’ পরিচয় দিয়ে এসব ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। জীবিকার তাগিদে দরিদ্র শ্রমিকরা ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে যুক্ত হয়ে প্রায়ই প্রাণ হারাচ্ছেন বা গুরুতর আহত হচ্ছেন। তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল একেএম জাকারিয়া কাদির বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাহিরপুর সীমান্তের এই মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দারিদ্র্য এবং সীমান্তজুড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতির নির্মম প্রতিফলন। একদিকে জীবিকার তাগিদে শ্রমিকদের জীবন বাজি রেখে বিদেশে প্রবেশ, অন্যদিকে দালাল চক্রের প্রভাব এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে বারবার ঝরে যাচ্ছে প্রান্তিক মানুষের প্রাণ। প্রশ্ন উঠছে সীমান্তে নজরদারি জোরদার থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এ ধরনের অবৈধ যাতায়াত অব্যাহত থাকে? কারা এই দালাল চক্রকে প্রশ্রয় দিচ্ছে? এবং কেনই বা ঝুঁকিপূর্ণ কয়লা খনিতে কাজ করতে গিয়ে বারবার মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, অথচ প্রতিরোধে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই? এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, দোষীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সীমান্ত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এখন সময়ের দাবি। নতুবা মজিবুর রহমানের মতো আরও অনেক শ্রমিকের প্রাণহানি কেবল সময়ের অপেক্ষা হয়ে থাকবে।


